Previous
এক গ্রামে বাস করত এক লোক।   সে পাথর খোদাই করে এটা ওটা তৈরি করত।   সে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অক্লান্ত পরিশ্রম করত।   খদ্দেরদের চাহিদা মাফিক পাথর কেটে বিভিন্ন জিনিস তৈরি করে দিত।
কখনও তৈরি করত থালা-বাটি, কখনও পাথর কেটে তৈরি করত ফুল পাতার নানা নকশা।   পাথর কাটার কাজ করত বলে তার হাত দুটো খুব শক্ত ছিল, কিন্তু জামা-কাপড় থাকত খুবই নোংরা।
একদিন সে বসে বসে অনেক বড় একটি পাথর কাটছে।   পাথরটি এত বড় ছিল যে কাটতে তার খুব কষ্ট হচ্ছিল, তার ওপর সেদিন ছিল প্রচণ্ড রোদ।   কয়েক ঘণ্টা টানা কাজ করার পর সে ক্লান্ত হয়ে পড়ে।   সে গাছের ছায়ায় বিশ্রাম নেয়ার জন্য বসল এবং এক সময় ঘুমিয়ে পড়ল।
কিছু সময় পর মানুষের কণ্ঠ শুনে লোকটি জেগে উঠল।   সে খানিকটা এগিয়ে গেল।   দেখল অনেক লোকের শোভাযাত্রা।   শোভাযাত্রায় অনেক সৈন্য-সামন্ত, সহচর এবং মাঝখানে একটা পালকিতে রাজা বসে আছেন।
কয়েকজন বিশাল দেহের শক্তিশালী মানুষ পালকি নিয়ে যাচ্ছে।   লোকটি ভাবল, যদি রাজা হতে পারতাম, তাহলে কি ভালোই না হতো! পাথর খোদাই-এর কাজ না করে রাজা হলে আমি কতই না সুখী হতাম।   লোকটি এই কথা বলার পরই এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটল।
সে অবাক হয়ে দেখে, তার পরনে দামী পোশাক, দামী দামী গহনা, হীরা জহরত।   তার হাত দুটো নরম এবং সে আরাম করে পালকিতে বসে আছে।   সে পালকির পর্দা সরিয়ে সবাইকে দেখল এবং ভাবল কত সহজে রাজা হওয়া যায়! এই যে এত এত লোক- সব তার সেবায় নিয়োজিত!
পাথর খোদাইকারী রাজাকে নিয়ে শোভাযাত্রা এগুতে লাগল, সূর্যের উত্তাপও বাড়তে লাগল।   রাজা গরম সহ্য করতে পারছেন না।   তিনি শোভাযাত্রার সৈন্য-সামন্তকে বললেন, এবার একটু থামো, আমাকে বিশ্রাম নিতে দাও।
সেনাপ্রধান রাজার পালকির সামনেই ছিলেন।   তিনি বললেন, হুজুর যদি আমরা সূর্যাস্তের আগে প্রাসাদে পৌঁছাতে না পারি তবে অন্ধকারে আমরা পথ খুঁজে পাব না।
সেনাপতির কথায় রাজা সায় দিলেন।   রাজার কষ্ট হলেও সবাইকে এগিয়ে যেতে বললেন।   বেলা বাড়ার সাথে সাথে সূর্যের উত্তাপ যত বাড়ল রাজার কষ্টও তত বাড়তে লাগল।
পাথর খোদাইকারী রাজা মনে মনে বললেন, আমার শক্তি, ক্ষমতা অনেক এটা সত্য, তবে সূর্য তো আমার চেয়েও শক্তিশালী।   রাজা না হয়ে আমি যদি সূর্য হতাম তাহলেই ভালো হতো।
সাথে সাথে রাজা সূর্য হয়ে গেল এবং পৃথিবীকে আলো দিতে শুরু করল।   এই নতুন শক্তি ও ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করা পাথর খোদাইকারীর জন্য খুব কঠিন ছিল।   সূর্যের তেজ বাড়তেই থাকল, তার তাপ দিয়ে সে মাঠ-ঘাট শুকিয়ে ফেলল।   সমুদ্রের পানিকে বাষ্পে পরিণত করল এবং সেই বাষ্প মেঘ হয়ে গেল।
সূর্য যতই তেজী হোক না কেন মেঘের জন্য সে আর পৃথিবী দেখতে পেল না।   সে তখন মনে মনে বলল, তাহলে তো মেঘ সূর্যের চেয়েও শক্তিশালী এবং ক্ষমতাধর।   সূর্য তখন মেঘ হতে চাইল।   সাথে সাথে সূর্য ঘন কালো মেঘে রূপান্তরিত হলো।   সে তার নতুন ক্ষমতা কাজে লাগাতে শুরু করল।
আকাশের মেঘ মাটিতে নেমে বৃষ্টি হয়ে মাঠ-ঘাট সব ডুবিয়ে দিল।   চারিদিকে বন্যা হলো।   গাছপালা, ঘর-বাড়ি পানিতে ভেসে গেল।   কিন্তু যে বড় পাথরটি সে খোদাই করছিল, সেটি পানিতে ভেসে গেল না।
পাথরটি যেমন ছিল তেমনই রয়ে গেল।   পাথরের উপর অনেক বৃষ্টি পড়ল কিন্তু পাথরটি একটুও নড়ল না।   পাথর খোদাইকারী মেঘ মনে মনে বলল, পাথরটি মেঘের চেয়েও শক্তিশালী!
সে ভাবে, একমাত্র একজন পাথর খোদাইকারীই তার বুদ্ধি আর পরিশ্রম দিয়ে পাথরকে পরিবর্তন করতে পারে।   মেঘ বলে, তাহলে আমি পাথর খোদাইকারীই হতে চাই।   আমার পাথর খোদাইর কাজই ভালো।   যার যে কাজ তাকে তাই করতে হয়।   আপন জগতে সবাই ক্ষমতাবান, সবাই রাজা।
কথাটা বলার সাথে সাথে সে নিজেকে একটি পাথরের ওপর বসে থাকতে দেখল।   তার হাত দুটো শক্ত আর খসখসে।   সে তার যন্ত্রপাতি নিয়ে আনন্দচিত্তে পাথর খোদাই করে চলে।   পাথরের গায়ে ফুটে উঠতে লাগল তার আঁকা ফুল-পাতার শোভা।
Next